মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে হরিরামপুর

২৫ মার্চ রাতে পাকহানাদার বাহিনীর আক্রমণের কথা ও বঙ্গবন্ধু র স্বাধীনতার ঘোষনা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে হরিরামপুর থানায় পৌছালে সেখানকার দেশপ্রেমিক জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বতঃফূর্তভাবে পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে এবং ২৫ মার্চ রাতেই পাটগ্রাম অনথা বন্ধু উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে সরকারি) থেকে সাইক্লোষ্টাইলকৃত প্রচারপত্রের মাধ্যমে পাকবাহিনীর আত্রমণ ও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।

হরিরামপুররের মুক্তিযুদ্ধসহ অন্যান্য বিষয় সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য হরিরামপুরে একটি হাই কমান্ড গঠন করা হয়। উক্ত হাই কমান্ড নিম্নবর্ণিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়।

(১) ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী –প্রধান, (২) অধ্যক্ষ আবদুর রউফ খান –দ্বিতীয় প্রধান, (৩) আবদুল মতিন চৌধুরী –সদস্য, (৪) আবদুর রশিদ খান মাষ্টার –সদস্য, (৫) মীর হাবিবুর রহমান –সদস্য, (৬) মীর মোতাহার হোসেন –সদস্য, (৭) খন্দকার লিয়কত আলী –সদস্য। উক্ত হাই কমান্ডের বিভিন্ন সদস্যদেরকে প্রশাসন, খাদ্য অর্থ, বিচার, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে প্রেরণ, ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠানো, অস্ত্র সংগ্রহসহ অন্যান্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

২৬ মার্চ বিকেল চারটায় সময় হরিরামপুরের লেছড়াগঞ্জ সাবরেজিস্টার অফিসের সামনে পরিস্থিতি আলোচনা এবং আশু করনীয় সম্পর্কে এক সর্বদলীয় সভা ডাঃ চিত্ত রঞ্জন দত্ত (ভোলা ডাক্তার) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত। এ সভায় মোহাম্মদ শাহজাহান, মোঃ ইয়াকুব আলী, খন্দকার লিয়কত আলী, মোঃ আওলাদ হোসেন প্রমুখ সংগ্রাম পরিষদ গঠন, প্রতিরোধের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ, তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গঠন ইত্যাদি বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। উক্ত সভায় ডাঃ চিত্ত রঞ্জন দত্তকে (ভোলা ডাক্তার) আহবায়ক করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। পাক বাহিনীর প্রতিরোধ ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গঠনের ব্যাপারে হরিরামপুরের বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরূপ একটি উল্লেখযোগ্য সভা হয় আঃ রশিদ মাষ্টারের সভাপতিত্বে সূতালড়ী ইউনিয়নের কোদালীয়া মাঠে।

হরিরামপুরের সংগ্রামী জনতার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২৭ মার্চ সর্বপ্রথম আনসার কমান্ডার, চাঁনমিয়া (হাটিপাড়া-বংখুরী) এর নেতৃত্বে লেছড়াগঞ্জে এবং ২৮ মার্চ আনসার কমান্ডার আঃ রব (সূতালড়ী) এর নেতৃত্বে সূতালড়ীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ হয়। মানিকগঞ্জ পতনের পূর্ব পর্যন্ত উক্ত ক্যাম্পে নিয়মিত  প্রশিক্ষণ চলে।

মানিকগঞ্জ শহর পতনের পর পরই ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী, মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া, মফিজুল ইসলাম খান কামাল প্রমুখ পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৌড়িতে পৌছান এবং হরিরামপুরের বিভিন্ন স্থানের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক এবং নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদদের সাথে সম্মিলিতভাবে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিপূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। অল্পকালের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক ছাত্র-যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণির জনগণ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে। স্থানীয় ভাবে সংগৃহীত অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই এ প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আজিমনগর, সূতালড়ী, কোদালিয়া, পাটগ্রাম, মালুচি, লেছড়াগঞ্জ, চানপুর, তরা, বোয়ালী, গোসাইর বাজার প্রভৃতি স্থাণে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে ওঠে। ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের কারণে একদিকে যেমন অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রয়োজন হয় তেমনি পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যও  অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। হরিরামপুরের নেতৃবৃন্দ বেশ কয়েকবার ফরিদপুর থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দানের কাজে উক্ত দু’জন আনসার কমান্ডার ব্যতীত সেনাবাহিনীর সদস্য এস. এ খালেক, দলিল উদ্দিন, লালু মুন্সী ও আবদুর রউফ প্রমুখ নিয়োজিত ছিলেন। জানা যায়, এপ্রিল মাসের মধ্য ভাগ থেকে হরিরামপুরে সংগ্রাম পরিষদের নামে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে হাতে লেখা প্রচার পত্র বিলি শুরু হয়। হরিরামপুরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং সংগঠনের ক্ষেত্রে এসময় প্রত্যক্ষ এবং নেপথ্যে পূর্বোল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অধ্যক্ষ আবদুর রউফ, আঃ মতিন চৌধুরী, আবদুর রশীদ মাষ্টার, মীর মোতাহার হোসেন, মীর হাবিবুর রহমান প্রমুখ।

৯ আগস্ট ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী দু’জন অবসর প্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্য নিয়ে নৌকাযোগে হরিরামপুরের মালুচি গ্রামে পৌছান। তিনি পূর্বেই খবর পেয়েছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কাজে লিপ্ত শিবালয় থানার তৎকালীন দারোগা ও বেশ কিছু পুলিশ মুক্তিযোদ্ধদের সংবাদ সংগ্রহে মালুচী এসেছেন। ছোট একটি নৌকা করে সাহাপট্টির বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে অতর্কিতে ইউনিয়ন পরিষধ কক্ষে অবস্থানরত দারোগা ও পুলিশদের আক্রমন করেন এবং অস্ত্র ফেলে আনুগত্য প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। সকল পুলিশ তৎক্ষণাৎ আনুগত্য প্রকাশ করে, কিন্তু উক্ত দারোগা বিলম্ব করলে এবং ক্যাপ্টেন হালিমকে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করলে ক্যাপ্টেন তৎক্ষণাতৎ তাকে গুলি করে হত্যা করেন। উক্ত ঘটনাস্থল থেকে ৪টি পিস্তল ও বেশ কয়েশ রাউন্ড গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।

১৮ আগস্ট পাক পাক সেনা হরিরামপুরের লেছরাগঞ্জে প্রবেশ করে। হরিরামপুররের বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের কথা তারা নানা সূত্র থেকে হয়তো তারা জানতো। ফলে ৩ সেপ্টম্বর পাক-বাহিনী হরিনা হতে লঞ্চ যোগ সুতালড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে তাঁদের বাধা দেয় এবং লঞ্চের ক্ষতি সাধিত হলে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

সুতালড়ী পুনঃআক্রমণের আশংকায় মুক্তিযোদ্ধারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এবং সুতালড়ীর তালকুদার বাড়ি, আদালতের বাড়ি ও সফি কাজীর বাড়িতে বাংকার করে অবস্থান নেয়, পাক সেনা যাতে পুনরায় লঞ্চযোগে না আসতে পারে সেই জন্য গর্জন খাঁ নামক জনৈক ব্যক্তির বাড়ির সামনে মোটা তার দিয়ে নদীতে ফাঁদ পেতে রাখা হয়। কিন্তু পাক বাহিনীর জনৈক সহযোগী ফাঁদের তার কেটে দেয়। এই ঘটনার পরে একদিন সকাল বেলা পাক সেনারা হঠাৎ করে প্রচন্ড গোলাগুলির মাধ্যমে সুতালড়ী প্রবেশ করে এবং বেশ বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয় ও কালা তমেজ নামে একটি লোককে গুলি করে হত্যা করে এবং মতিয়া বেগম নামে অপর একজন মহিলা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাক বাহিনীর আক্রমণের মুখে ৭-৮টি রাইফেল নিয়ে স্বাভাবিক কারণেরই মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটতে বাধ্য করে। ২৪ সেপ্টেম্বর পাক সেনা লঞ্চ, গানবোট ও বিমানযোগে আজিমনগর আক্রমণ করে প্রচন্ড গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময়ে পাক সেনারা বেশ ‍কিছু ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।। মুক্তিযোদ্ধারা এখানে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করলেও লঞ্চ, গানবোট, স্থল ও বিমান থেকে তীব্র আক্রমণের ফলে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যায়। এ যুদ্ধে কোন মুক্তিযোদ্ধা নিহত বা আহত হয়নি বলে জানা যায়।

২৪ সেপ্টেম্বররের আজিমনগরের যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী পুনরায় দৃঢ় মনোবল এবং ব্যাপকভাবে অস্ত্র গোলাবারুদ সংগ্রহের মাধ্যমে সংগঠিত হতে থাকে। ইতিমধ্যে ভারত থেকে পাঠানো রাইফেল, গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ভর্তি একটি নৌকা ঢাকা কেরানীগঞ্জ হয়ে আসার সময় কলাতিয়া নামক স্থানে পাক বাহিনী কর্তৃক ধৃত হয় এবং তারা নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকদিন ধরে অধম্য মনোবল নিয়ে বহু কষ্ট করে ডুবিয়ে রাখা অস্ত্র উদ্ধার করতে সমর্থ্য হয়। উক্ত অস্ত্রগুলি পাবার পর মুক্তিযোদ্ধারা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ১৩ অক্টোবর হরিরামপুরের সি.ও অফিসে অবস্থিত পাকবাহিনীর ক্যাম্প দখলের পরিকল্পনা করে এবং প্রবল বাধার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও তারা উক্ত ক্যাম্প দখল করতে সক্ষম হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্যাম্প দখলে সময় পাঁচজন বেলুচ সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ অবলম্বন করে বলে জানা যায়। এ যুদ্ধে ৬০/৭০ জন পাক সৈন্য নিহত এবং ৭০টি রাইফেল, ৩টি এলএমজি ও ৭ বক্সগুলি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। পাকবাহিনীর ক্যাম্প দখলের পর  ওয়্যারলেস অফিস পুড়িয়ে দেবার সময় হঠাৎ করে মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমানের সমস্ত শরীরে আগুন ধরে যায় এবং পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পান্নু মোল্লা নামে আরেক মুক্তিযোদ্ধা আগুনে পুড়ে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক ডাঃ চিত্ত রঞ্জন দত্তের (ভোলা ডাক্তার) চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠেন।

১৫ অক্টোবর দিবাগত রাত নয়টায় পাকবাহিনী সূতালড়ী গ্রাম আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধের সৃষ্টি করে এবং ঐ রাত হতে পরদিন সকাল দশটা পর্যন্ত উভয় পক্ষের তীব্র যুদ্ধ চলতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে পাকসেনারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

১৭ অক্টোবর পাকসেনারা পুনরায় গানবোট সহকারে সকাল সাতটায় সূতালড়ী গ্রামে আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধারা এসময়ে পূর্বেই প্রস্তুত থাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হয়, প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকসেনারা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়ে। ঐদিনই পাকসেনারা গানবোটে সজ্জিত হয়ে প্রায় তিনশত রংবাজ, খামার, ডিঙ্গি, ইব্রাহিমপুর, দৌলতপুর, প্রভৃতি স্থান দখলের চেষ্টা করে। এসমস্ত রণক্ষেত্রেও মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধের সৃষ্টি করে এবং অবশেষে পাকসেনারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়ে।

হরিরামপুরের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম খন্দকার লিয়াকত আলী (সূতালড়ী), আবদুল হাকিম (খলিলপুর), রাকীব (লক্ষীকূল) বজলুল হুদা (সূতালড়ী), শহীদ মাহফুজুর রহমান, শহীদ নওশের (হরিনা), বাবু (হরিনা), আবুল কাশেম (সূতালড়ী), সোহরাব (সূতালড়ী), গোলাম মহিউদ্দিন (রামকৃষ্ণপুর), অসিতনাগ (জগন্নাথপুর), হাকিম উদ্দিন (ঝিটকা), হালিম (রামকৃষ্ণপুর, (সিরাজ উদ্দিন (ভাটিকান্দি), ওহাব (সূতালড়ী), আবুল বাশার (মহেশপুর), হারুনার রশিদ (গঙ্গারামপুর-ধূলশুড়া), শুকুর চৌধুরী (ইব্রাহিমপুর), শামসুদ্দিন (সূতালড়ী)।

ছবি

Fridom.jpg Fridom.jpg
Fridom.jpg Fridom.jpg
Fridom.jpg Fridom.jpg